প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সব নবীই ছিলেন আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত ও মানব সমাজের জন্য ইলমে ওহীর শিক্ষক ও বাহক। আর আল্লাহ তাআলা যত নবী ও রসুল পাঠিয়েছেন তারা সবাই ছিলেন শিক্ষক। নতুন নতুন জ্ঞানের ধারাও চালু করেছেন তারা। তারা সরাসরি জনগণকে শিক্ষা দিতেন। গণমানুষ ছিল তাদের শিক্ষার্থী। বিশেষত: মহানবী মুহাম্মাদ সা. সকলের জন্য শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন।
°
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَالَّذِیۡ بَعَثَ فِی الۡاُمِّیّٖنَ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ ٭ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেবে, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিপতিত ছিলো। (সূরা আল জুমুআহ :২)
°
অন্য আয়াতে বলেন,
لَقَدۡ مَنَّ اللّٰہُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি (অতি বড়) অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের কাছে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, আর নিশ্চয় এর আগে তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে ছিলো। (সূরা আলে ইমরান : ১৬)
°
অন্য আয়াতে বলেন,
کَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡکُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡکُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِنَا وَیُزَکِّیۡکُمۡ وَیُعَلِّمُکُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَیُعَلِّمُکُمۡ مَّا لَمۡ تَکُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ
(এ অনুগ্রহ ঠিক সেই রকমই) যেমন আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য হতে, যে তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করে, তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমতের তালীম দেয় এবং তোমাদেরকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না। (সূরা আল বাকারা : ১৫১)
°
মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষক ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগী ছিলেন এবং শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতেন। একজন শিক্ষকের সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা বুঝাতে নিজেকে মুআল্লিম তথা শিক্ষক বলে অবহিত করেছেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ يَوْمٍ مِنْ بَعْضِ حُجَرِهِ فَدَخَلَ الْمَسْجِدَ فَإِذَا هُوَ بِحَلْقَتَيْنِ إِحْدَاهُمَا يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ وَيَدْعُونَ اللَّهَ وَالأُخْرَى يَتَعَلَّمُونَ وَيُعَلِّمُونَ فَقَالَ النَّبِيُّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ “ كُلٌّ عَلَى خَيْرٍ هَؤُلاَءِ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ وَيَدْعُونَ اللَّهَ فَإِنْ شَاءَ أَعْطَاهُمْ وَإِنْ شَاءَ مَنَعَهُمْ وَهَؤُلاَءِ يَتَعَلَّمُونَ وَيُعَلِّمُونَ وَإِنَّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّمًا ” . فَجَلَسَ مَعَهُمْ .
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক হুজরা থেকে বের হয়ে এসে মসজিদে প্রবেশ করেন। তখন সেখানে দুটি সমাবেশ চলছিল। একটি সমাবেশে লোকজন কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহ্র যিকরে মশগুল ছিল এবং অপর সমাবেশে লোকজন শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে রত ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সকলেই কল্যাণকর তৎপরতায় রত আছে। এই সমাবেশের লোকজন কুরআন তিলাওয়াত করছে এবং আল্লাহ্র নিকট দুআ করছে। তিনি চাইলে তাদের দান করতেও পারেন আবার চাইলে নাও দিতে পারেন। অন্যদিকে এই সমাবেশের লোকেরা শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে রত আছে। আর আমি শিক্ষক হিসাবেই প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর তিনি এদের সমাবেশে বসলেন। (ইবনু মাজাহ হা/২২৯; সুনান দারামী : ৩৪৬)
°
মু‘আবিয়া বিন হাকাম আস-সুলামী (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা আমি রাসুল (সা.)-এর সাথে সালাতে ছিলাম। হঠাৎ এক ব্যক্তি (নামাজের মধ্যে) হাঁচি দিল। প্রতিউত্তরে আমি ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললাম। লোকজন তখন আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। আমি বলে উঠলাম, আপনাদের কী হয়েছে? আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? লোকজন তাদের উরুতে হাত চাপড়িয়ে আমাকে শান্ত ও চুপ হতে ইঙ্গিত করল। আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসুল (সা.) সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করলেন। আমার পিতামাতা তাঁর প্রতি উৎসর্গিত হোন,
مَا رَأَيْتُ مُعَلِّمًا قَبْلَهُ وَلاَ بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ فَوَاللهِ مَا كَهَرَنِى وَلاَ ضَرَبَنِى وَلاَ شَتَمَنِى
তার মতো এত উত্তম ও সুন্দর শিক্ষাদানকারী কোনো শিক্ষক তার আগেও কাউকে দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে না প্রহার করলেন, না তিরস্কার করলেন, না ধমক দিলেন; তিনি বললেন, আমাদের এই নামাজ মানুষের কথাবার্তার উপযোগী নয়। (অর্থাৎ নামাজে এ ধরনের কথা বলা যায় না।) বরং এ তো হল তাসবিহ, তাকবির ও তেলাওয়াতে কোরআন। (মুসলিম : ৫৩৭ নাসাঈ হা/১২১৮; মিশকাত হা/৯৭৮। ) ।
°
অন্য বর্ণনায় রয়েছে,
فَمَا رَأَيْتُ مُعَلِّمًا قَطُّ أَرْفَقَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم.
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অধিক দয়ালু ও বিনয়ী কোন শিক্ষক কখনও দেখি নাই। (সুনান আবু দাউদ : ৯৩১)
°
রাসূল সা. উম্মাতের সব কিছু শিক্ষাদানের শিক্ষাগুরু ছিলেন।
عَنْ سَلْمَانَ، قَالَ قَالَ لَنَا الْمُشْرِكُونَ إِنِّي أَرَى صَاحِبَكُمْ يُعَلِّمُكُمْ حَتَّى يُعَلِّمَكُمُ الْخِرَاءَةَ . فَقَالَ أَجَلْ.
সালমান (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকরা একবার আমাকে বলল, আমরা দেখছি তোমাদের সাথী রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে সব কাজই শিক্ষা দেয়; এমনকি প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ম নীতিও তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়! (জবাবে) তিনি বললেন, হ্যাঁ, (মুসলিম, ই.ফা. ৪৯৮, মুসলিম, ই.সে. ৫১৪)
°
অন্য হাদিসে বলেন,
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ يَزِيدَ، عَنْ سَلْمَانَ، قَالَ قِيلَ لَهُ لَقَدْ عَلَّمَكُمْ نَبِيُّكُمْ كُلَّ شَىْءٍ حَتَّى الْخِرَاءَةَ .
সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বর্ণনাকারী ‘আবদুর রহমান বলেন, সালমান (রাঃ) কে বলা হলো, তোমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে সবকিছুই শিক্ষা দিয়েছেন, এমন কি পায়খানা করার নিয়মও।
(সহিহ মুসলিম : ৪৯৪, ৪৯৫)
°
রাসূল সা. পিতৃসুলভ মমতায় উম্মাতকে শিক্ষা দিয়েছেন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ إِنَّمَا أَنَا لَكُمْ بِمَنْزِلَةِ الْوَالِدِ أُعَلِّمُكُمْ
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি তোমাদের জন্য পিতৃতুল্য, তোমাদেরকে আমি দীন শিক্ষা দিয়ে থাকি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৮)
°
রাসূল সা. সহজ- সরল পন্থায় শিক্ষাদানের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَبْعَثْنِي مُعَنِّتًا وَلاَ مُتَعَنِّتًا وَلَكِنْ بَعَثَنِي مُعَلِّمًا مُيَسِّرًا ” .
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে কঠোরতা আরোপকারী ও অত্যাচারীরূপে নয় বরং প্রতিটি বিষয়ে সহজ-সরল পন্থার শিক্ষাগুরু হিসেবে প্রেরণ করেছেন। (সহিহ মুসলিমই.ফা. ৩৫৫৩, ই.সে. ৩৫৫৩)