প্রবন্ধ

পরপুরুষের সামনে নারীদের চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক

প্রকাশকাল: 12/05/2025

পরপুরুষের সামনে নারীদের চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক

একজন মসলিম নারী অবশ্যই তার চেহারা ঢেকে রাখবে। নবীজীর যুগ থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন যুগ হয়ে বর্তমান পর্যন্ত এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ও অনুসৃত যে, নারীরা পরপুরুষের সামনে চেহারা খুলবে না, ঢেকে রাখবে। নবীজীর সকল বিবি এ আমলের উপরই ছিলেন। এভাবেই সাহাবা তাবেয়ীন থেকে নিয়ে অদ্যাবধি দ্বীনদার নারীদের আমল চলে আসছে।

সাহাবায়ে কিরামকে মহান ‍আল্লাহ লক্ষ করে ঘোষণা করেন, وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ অর্থাৎ, নবীর স্ত্রীগণের কাছে তোমরা কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাবে। এ পন্থা তোমাদের অন্তর ও তাদের অন্তর অধিকতর পবিত্র রাখার পক্ষে সহায়ক হবে। [সুরা আহযাব: ৫৩] বিবৃত আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নারীদের চেহারা বা অন্য কোনো অঙ্গকে পর্দার বিধান থেকে আলাদা করেন নি। তাই পর্দার বিধানে চেহারা ও পা সহ সমস্ত শরীর অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে বলেন, وَ لَا یَضْرِبْنَ بِاَرْجُلِهِنَّ لِیُعْلَمَ مَا یُخْفِیْنَ مِنْ زِیْنَتِهِنَّ অর্থাৎ, মুসলিম নারীদের যমিনে এমনভাবে পা ফেলা উচিৎ নয়, যাতে তাদের গোপন সাজ সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়ে যায়। [সূরা নূর: ৩১] উপরোক্ত আয়াতে নারীদের নূপুর দেখা যেতে পারে বা তার আওয়াজ শোনা যেতে পারে, তাই জোরে পা ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে সকল সৌন্দর্যের কেন্দ্র চেহারা খোলা রাখার বৈধ হওয়ার প্রশ্নই অবান্তর।

উম্মুল মুমিনিন আম্মজান হযরত আয়েশা রা. বলেন, كنا مع النبي صلى الله عليه و سلم ونحن محرمون. فإذا لقينا الراكب أسدلنا ثيابنا من فوق رءوسنا. فإذا جاوزنا رفعناها অর্থাৎ, আমরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। তখন আমাদের পাশ দিয়ে হজ্ব-কাফেলা অতিক্রম করত। তার যখন আমাদের সমানাসামনি চলে আসতো তখন আমরা সকলেই চেহারার ওপর উড়না টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে তা আবার সরিয়ে ফেলতাম। [ইবনে মাজাহ: ২৯৩৭]

হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর রা. বলেন, فدخل، ورسول الله صلى الله عليه وسلم قد توفي على الفراش والنسوة حوله، فخمرن وجوههن، واستترن من أبي بكر إلا ما كان من عائشة অর্থাৎ, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল হয়ে গেলে আবু বকর রা. ঘরে প্রবেশ করেন। এসময় আশেপাশে তাঁর স্ত্রীগণ ছিলেন। আবু বকর রা. প্রবেশ করতে চাইলে আয়েশা রা. ছাড়া সকলে মুখ ঢেকে ফেলেন। [দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী: ৭/১১৭]

কিছু দলিলকে সামনে রেখে ফিতনার আশঙ্কা না থাকার শর্তে ইমাম আবু হানিফা রহ. সেই সোলানী যুগে নারীর চেহারা খোলা রাখার বৈধতার মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী যুগে যখন ফিতনা প্রকাশিত হয়ে শর্ত বিলীন হয়ে যায়, তখন ইমাম আবু হানিফার মূলনীতির আলোকেই তা অবৈধ হয়ে যায়। তাই নারীর চেহারা পর্দা করা ফরয, অপর পুরুষের সামনে খোলা রাখা অবৈধ।

পরপুরুষের সামনে নারীদের চেহারা ঢেকে রাখা ফর‌য। এটা শুধু ফিকহে হানাফির ফাতাওয়া নয়; বরং তা চার মাযহাবের সম্মিলিত অবস্থান। শায়খ আহমাদ ইসমাইল বলেন, نستطيع أن نخلص مما تقدم بأن علماء المذاهب الأربعة يكادون يتفقون على تغطية المرأة جميع بدنها عن الأجانب… يوجب تغطيتهما فى هذا الزمان لفساد أكثر الناس অর্থাৎ, উপরোক্ত বিষয় থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, চার মমাযহাবের আলেমরা একমত যে, একজন নারীর উচিত অপরিচিতদের সামনে তার পুরো শরীর ঢেকে রাখা…। এই যুগে বেশিরভাগ মানুষ অত্যাধিক ফিতনা-ফাসাদে জর্জরিত হওয়ার কারণে মহিলাদের উভয় হাত ও চেহারা ঢেকে রাখা ফরয। [আদিল্লাতুল হিজাব, দারুল ঈমান: ৪৭৪]

”পরপুরুষদের কাছে নারীদের চেহারা ঢেকে রাখা ফরয” এই বিষয়ে আহলে সুন্নাহের সবার মাঝে ইজমা থাকার পরেও কেউ কেউ পবিত্র কুরআনের সুরা নুরের ৩১ নাম্বার আয়াতের অংশ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا এর ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.’র বর্ণনা পেশ করে বলতে চান যে, নারীদের চেহারা ও হাত খোলা রাখা জায়েয। আলোচিত অংশের আসল তাফসির আমরা মাজমুউল ফাতাওয়া থেকে জেনে নেব ইংশা আল্লাহ।

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহি. বলেন, الوجه واليدان والقدمان ليس لها أن تبدى ذلك للأجانب ـ على أصح القولين – بخلاف ما كان قبيل النسخ بل لا تبدى إلا الثياب অর্থাৎ, নারীদের মুখ, হাত এবং পা পরপুরুষদের দেখানো বৈধ নয়। এটিই সবচেয়ে সঠিক অভিমত, আর বাকিগুলো রহিত হয়ে গেছে। বরং নারীরা কেবল পোশাক-আশাক প্রকাশ করতে পারে। [মাজমুউল ফাতাওয়া: ২২/১১৪] ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহি.-এর ফাতাওয়া থেকে এটা ‍স্পষ্ট যে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনাটা পর্দার আয়াত নায়িল হওয়ার পূর্বেকার।

Scroll to Top