প্রবন্ধ

জিহাদ কখন ফরযে আইন ও কখন ফরযে ফিফায়া?

প্রকাশকাল: 23/03/2025

জিহাদ কখন ফরযে আইন ও কখন ফরযে ফিফায়া?

প্রথমে আমরা জেনে নেবো যে, ফরযে আইন ও ফরযে ফিফায়ার মানে কী?

ফরযে ফিফায়ার মানে হল, এমন ফরয যার দায়িত্ব সমষ্টিগতভাবে সকল মুসলমানের। যথেষ্ট পরিমাণ মুসলমান যদি সেই ফরয আদায় করে, তাহলে সকলের দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে সবার উপর এর দায় থেকে যায় এবং সবাই গোনাহগার হয়।

পক্ষান্তরে ফরযে আইন মানে হল, এমন ফরয যা সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উপর ফরয হয়। যার যার উপর ফরজ হয়, তাদের সবাইকে তা আদায় করতে হয়। অন্যথায় প্রত্যেকেই গোনাহগার হয়।

প্রশ্নের অংশ দু’টি হবার কারণে উত্তরটাও দু’টি শিরোনামেই বুঝার চেষ্টা করবো ইন শা আল্লাহ।

জিহাদ কখন ফরযে আইন হয়?

জিহাদ সাধারণত তিন অবস্থায় ফরযে আইন হয়। এর মানে হচ্ছে, নির্দিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর জিহাদ ফরয হয়। আর আদায় না করলে প্রত্যেকেই গোনাহগার হয়।

ইমাম ইবনে কুদামা মাকদিসি রহ. (৬২০ হি.) বলেন-

يتعين الجهاد في ثلاثة مواضع؛ أحدها، إذا التقى الزحفان، وتقابل الصفان؛ حرم على من حضر الانصراف، وتعين عليه المقام … الثاني، إذا نزل الكفار ببلد، تعين على أهله قتالهم ودفعهم. الثالث، إذا استنفر الإمام قوما لزمهم النفير معه

তিন অবস্থায় জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়

১. যখন ঈমান ও তাগুতের দুই বাহিনী লড়াইয়ের জন্য কাতারবন্দি হয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন উপস্থিত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য পলায়ন করা হারাম এবং অটল থেকে জিহাদ করা ফরজে আইন।

২. কাফেররা কোনো এলাকায় আক্রমণ চালালে উক্ত এলাকার অধিবাসীদের উপর তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করা এবং তাদের প্রতিরোধ করা ফরজে আইন।

৩. ইমাম যদি কোনো সম্প্রদায়কে জিহাদে বের হতে আহ্বান করেন, তাহলে তাদের সকলের জন্য জিহাদে বের হওয়া ফরজে আইন। -আলমুগনী: ১২/৪২৩

আমাদের হানাফি মাযহাবসহ সকল মাযহাবেই স্বীকৃত ফাতাওয়া এটাই। এর ওপরই উম্মাহের ইজমা রয়েছে। বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৮০ নাম্বার পৃষ্ঠায় আলোচিত ফাতাওয়া ইজমাসহ বর্ণিত হয়েছে। এখানে শুধু ইবারত উল্লেখ করা হল।

أجمع العلماء على أن الجهاد يكون فرض عين في ثلاثة أحوال :الأول: أن يستنفر الإمام شخصاً أو جماعة للقتال، ففي هذه الحالة يتعين الخروج على من طلب للجهاد … :الثاني: أن يدخل العدو بلاد المسلمين، أو يتغلب على قطر من أقطارهم، فيتعين القتال حينئذ،… .الثالث : عند التقاء الصفين يجب على من حضر القتال، ويحرم الانصراف إلا إذا كان مُتَحَرِّفَاً لقتال أو متحيزاً إلى فئة

জিহাদ কখন ফরযে কিফায়া হয়?

উল্লেখিত তিনটি অবস্থা ছাড়া সাধারণ অবস্থায় জিহাদ ফরযে কিয়ায়া বলে বিবেচিত হয়।
অর্থাৎ যখন ঈমান ও তাগুতের দুই বাহিনী লড়াইয়ে লিপ্ত হয়নি বা কাফেররা ইসলামী ভূখণ্ডের কোনো এলাকায় আক্রমণ চালায়নি অথবা ইমাম যদি কোনো সম্প্রদায়কে জিহাদে বের হতে আহ্বান না জানান, তাহলে এই অবস্থায় জিহাদে বের হওয়া ফরযে কিফায়া।

তার মানে হচ্ছে কাফেরদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত রাখার জন্য যেই পরিমাণ লোকের প্রয়োজন, পুরো উম্মত থেকে সেই পরিমাণ লোক যদি জিহাদি কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন, তাহলে জিহাদ ফরযে কিফায়া বলে গণ্য হবে। হেদায়া গ্রন্থকার আল্লামা মারগিনানি রহ. (৫৯৩ হি.) বলেন- قَالَ الْجِهَادُ فَرْضٌ عَلَى الْكِفَايَةِ، إذَا قَامَ بِهِ فَرِيقٌ مِنْ النَّاسِ سَقَطَ عَنْ الْبَاقِينَ অর্থাৎ জিহাদ ফরযে কিফায়া হয় তখন, যখন যথেষ্ট পরিমাণ মুসলিম তাতে যুক্ত থাকেন। আর তখনই বাকি মুসলিমরা যিম্মাদারি মুক্ত হয়। -হেদায়া; ফাতহুল কাদিরসহ: ৫/৪৩৬-৪৪১

বর্তমান বিশ্বের সকল মুসলিমের ওপর জিহাদ ফরযে আইন

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, পুরো বিশ্বের কাফেরজুট মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে দুইভাবে আক্রমণ চালিয়ে খতম করেছে। হয়তোবা প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে ফিলিস্তিন, উইঘুর, কাশ্মীর, বসনিয়া, চেসনিয়া, আফগান, ইরাক ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে লাখো লাখো মুসলিম বনি আদমকে হত্যা ও নির্যাতন করেছে, নয়তোবা সরাসরি আক্রমণে না গিয়ে পরোক্ষভাবে নিজেদের শাসন গণতন্ত্রকে বল প্রয়োগে মুসলিম দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে ইসলামী শারিয়ার শাসন বিদূরিত করেছে।

বর্তমান বিশ্বের সকল মুসলিম কাফেরদের আগ্রাসনের শিকার। হয়তো প্রত্যক্ষভাবে নয়তো পরোক্ষভাবে। সেজন্য আজ বিশ্বের সকল মুসলিমের ওপর জিহাদ ফরযে আইন। সশরীরে, মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে, অর্থ দিয়ে, দল ভারি করে; মোটকথা যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তার উপর ততটুকু দিয়েই এই জিহাদে অংশ গ্রহন করা ফরয আইন।

Scroll to Top