দুনিয়ার জীবন বড়ই ব্যস্ততাপূর্ণ। দুনিয়ায় কাজই এমন, যা আখেরতকে ভুলিয়ে রাখে। তাই সহজেই সুযোগ হয় না পরকালীন জীবন নিয়ে ভাবার; কিংবা একান্ত মনোযোগের সাথে ইবাদত লিপ্ত হবার। আমাদের ইতিকাফ মূলত সেই ইবাদতের সুযোগকেই সহজতর করে। বান্দাকে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হতে সাহায্য করে।
ইতিকাফের পরিচয়
ইতিকাফ আরবী শব্দ। যার অর্থ হল, অবস্থান করা, অভিমুখী হওয়া, নিবেদিত হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি।
পরিভাষায় ইতিকাফ হল, ইবনে হাযাম রাহি. “আল মুহাল্লা” এর ৫/১৭৯ তে বলেন,
هو الإقامةُ في المسجد بنيَّةِ التقرُّبِ إلى الله عز وجل ساعةً فما فوقها ليلًا أو نهارا
দিনে হোক বা রাতে অল্প সময়ের জন্য হলেও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অভিপ্রায়ে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়।
ইতিকাফ তিন প্রকার: ১. ওয়াজিব: যেমন মানতের ইতিকাফ এবং সুন্নত ইতিকাফ নষ্ট হলে কাযা ইতিকাফ । ২. মুস্তাহাব: যেমন রমযানের শেষ ১০ দিন ব্যতীত যতো ইতিকাফ করা হবে, তা সবই মুস্তাহাব ইতিকাফ। ৩. সুন্নাতে মুআক্কাদাহ: যেমন রমযানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া। ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২৩২ তে উল্লেখ আছে,
واجب وهو المنذور تنجيزا أو تعليقا وإلى سنة مؤكدة وهو في العشر الأخير من رمضان وإلى مستحب وهو ما سواهما هكذا في فتح القدير.
ইতিকাফের স্থান
সাওয়াবের দিক থেকে ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হল মসজিদে হারাম। এরপর মসজিদে নববী। তারপর মসজিদে আকসা। এরপর যেকোনো জামে মসজিদ। তারপর যেকোনো পাঞ্জেগানা মসজিদ। তবে নারীদের জন্য ইতিকাফের স্থান হল ঘরের নির্দিষ্ট কোনো স্থান। ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২৩২ ; মাবসূত, সারাখসী : ৩/১১৫ তে উল্লেখ আছে,
وأفضل الاعتكاف ما كان في المسجد الحرام ثم في مسجد النبي عليه الصلاة والسلام ثم في بيت المقدس ثم في الجامع ثم فيما كان أهله أكثر وأوفر كذا في التبيين، والمرأة تعتكف في مسجد بيتها إذا اعتكفت في مسجد بيتها
ইতিকাফের ফযীলত
ইতিকাফ শিআরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত একটি মাসনূন আমল। উপরন্তু রমযানের ফযীলত ও বরকত লাভ করার ক্ষেত্রে ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম। হাদীস শরীফে এসেছে-
أن النبيَّ صلى الله عليه وسلم كان يعتكِفُ العشرَ الأواخِرَ من رمضانَ، فلم يعتكِفْ عاماً، فلما كان العامُ المُقْبِلُ اعتكفَ عشرينَ ليلةً.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেছেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৬৩
ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভ করার সম্ভাবনাও অনেক বেশি থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর লাভের আশায় একবার রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেন। এরপর কয়েকবার ইতিকাফ করেন মাঝের দশ দিন। এরপর একসময় শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে শুরু করেন এবং ইরশাদ করেন-
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ.
তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২০
ইতিকাফের আদব সমূহ
ভালো কথা ছাড়া আর কিছু না বলা। মসজিদে হারাম ও জামে মসজিদকে ইতিকাফের জন্য নির্ধারণ করা। সাধ্যমত কুরআন তিলাওয়াত করা। হাদিসে নববি পাঠ করা। তাসবিহ তাহলিল পাঠ করা। দ্বীনি মাসআলা-মাসায়েল আলোচনা করা। নবি ও সালিহিনদের জীবনী জানা। দ্বীনি বিষয় লেখালেখি করা। ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২৩৩ উল্লেখ আছে,
فأن لا يتكلم إلا بخير وأن يختارأفضل المساجد كالمسجد الحرام والمسجد الجامع كذا في السراج الوهاج، ويلازم التلاوة والحديث والعلم وتدريسه وسير النبي والأنبياء عليهم السلام وأخبار الصالحين وكتابة أمورالدين
মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধান
ইতিকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় তাহলে তার ইতিকাফ ভেঙে যাবে। তবে কিছু কারণে সে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে কিন্তু তখনও প্রয়োজনের অতিরক্ত সময় ব্যয় করলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
যে প্রয়োজনগুলোতে মসজিদ থেকে বের হওয়া যায়,
- পেশাব-পায়খানার প্রয়োজনে
- উযূ ও ফরয গোসলের জন্যে
- অন্যত্রে জুমা আদায়ের দরকার হলে
- বাসা থেকে খাবার আনার কেউ না থাকলে
- ইতিকাফকারী মুআযযিনের আযানের স্থান ভিন্ন হলে
কারও যদি গোসল ছাড়া থাকা একিবারেই কষ্টকর ও অসম্ভব হয়, তার জন্য ফুকাহায়ে কিরাম একটা সূরত আলোচনা করেছেন, সেটি হল ইতিকাফকারী ব্যক্তি গোসল খানায় আগে থেকে কাউকে দিয়ে পানি প্রস্তুত রাখবে। তারপর পেশাব-পায়খানার জন্য বের হয়ে অযু করতে যে পরিমান সময় লাগে সে পরিমাণ সময়ে গোসল করতে পারবে। এর চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করা যাবে না।
উল্লেখিত মাসআলা সমর্থনে একটা হাদিস পেশ করছি, যা ইমাম বুখারি রাহি. উল্লেখ করেছেন। হাদিস নং ৩০১,
وَكَانَ يُخْرِجُ رَأْسَهُ إِلَىَّ وَهُوَ مُعْتَكِفٌ، فَأَغْسِلُهُ وَأَنَا حَائِضٌ.