কুরআনের যে সমস্ত আয়াত ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সকল হাদিসে জিহাদের আদেশ করা হয়েছে, সেগুলোতে জিহাদের জন্য আমীর বা শাসক থাকতে হবে বলে কোনো রকম শর্তারোপ করা হয়নি; বরং এ আয়াত ও হাদিসগুলো ব্যাপক ও শর্তমুক্ত। তাই নিজেদের পছন্দমতো শারিয়ার কোন বিধানের মাঝে যেকোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। জিহাদের জন্য খলিফা থাকা আবশ্যক হওয়ার কথা সালাফদের কেউ কখনো বলেননি । তবে যদি খলিফা বিদ্যমান থাকেন, তাহলে আক্রমণাত্মক জিহাদের অনুমতি তার থেকে নেওয়া কর্তব্য। আর প্রতিরক্ষা মূলক জিহাদে কোন শর্ত নেই ,যার আলোচনা সামনে আসছে।
সালাফদের বুঝ বিবর্জিত হাদিসের কোন কোন অংশকে কেটে এনে “আমীর ছাড়া জিহাদ নাই” প্রমাণ করা অথবা খলিফা-অবিদ্যমান অবস্থাকে বিদ্যমান অবস্থার সাথে গুলিয়ে ফেলা এক ভয়ংকর বিষয়। শারিয়ার বিধানে নিজ থেকে শর্তারোপের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
مَا بالُ أقْوَامٍ يشْترِطُونَ شُرُوطاً لَيْسَتْ فِي كِتَابِ اللَّهِ مَنِ اشْتَرَطَ شَرْطاً لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَلَيْسَ لَهُ وَإِن اشْتَرَطَ مائَةَ مَرَّةٍ
লোকদের কী হলো? তারা এমন সব শর্ত করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই। কেউ যদি এমন শর্তারোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই, তার সে শর্তের কোন মূল্য নেই। এমনকি এরূপ শর্ত একশবার আরোপ করলেও। – সাহিহ বুখারির ৪৫৬
জিহাদ দুই প্রকার :
প্রথম প্রকার জিহাদ হলো প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ
প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ হচ্ছে, সে সব কাফির শুত্রুকে প্রতিহত করা, যারা মুসলমানদের দেশ ও ইজ্জতের উপর আক্রমণ করে। এ প্রকারের জিহাদ সে সব মুসলমানের উপর ফরয, যাদের দেশ ও সীমানায় শত্রু পক্ষ আক্রমণ করেছে। যদি তারা শুত্রুদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম না হয় বা অলসতা করে, তাহলে তাদের পার্শ্ববর্তী মুসলমাদের উপর জিহাদ ফরয হয়। এভাবে প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে এবং পুরো বিশ্বের সমস্ত মুসলিমদের ওপর তা ফরয বলে বিবেচিত হয়।
এ প্রকার জিহাদের জন্য ব্যাপক শক্তিধর ইমাম ও জামাআত থাকা শর্ত নয়। যদি ইমাম বা জামাআত পাওয়া যায় তাহলে ভালো। আর যদি না পাওয়া যায় তাহলে প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজ উদ্যোগে যথাসাদ্ধ জিহাদে বেরিয়ে পড়া ফরয। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার রহিমাহুল্লাহ একদম স্পষ্ট করেই বলেছেন, দিফায়ী জিহাদের জন্য কোনো শর্তই প্রযোজ্য নয়; বরং সকলের জন্যই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মোকাবেলা করা জরুরি। তিনি বলেন-
وأما قتال الدفع فهو أشدّ أنواع دفع الصائل عن الحرمة والدين، فواجب إجماعاً، فالعدوُّ الصائلُ الذي يفسد الدين والدنيا لا شيء أوجب بعد الإيمان من دفعه، فلا يشترط له شرط، بل يدفع بحسب الإمكان، وقد نصَّ على ذلك العلماء أصحابنا وغيرهم
প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ, যা মুসলমানদের দীন ও সম্মানের উপর আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করার সবচেয়ে গুরুতপূর্ণ স্তর এবং সর্বসম্মতিক্রমে ফরয। যে আগ্রাসী শক্তি মুসলমানদের দীন-দুনিয়া ধ্বংস করে, ঈমানের পর তাকে প্রতিরোধের চেয়ে গুরুতর ফরয দ্বিতীয় আরেকটি নেই। এই ক্ষেত্রে কোনো শর্ত প্রযোজ্য নয়, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের ও অন্যান্য (মাযহাবের) ফুকাহায়ে কেরাম সকলেই তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। -আল ফাতাওয়াল কুবরা ৪/৬০৮
দ্বিতীয় প্রকার জিহাদ হলো আক্রমনাত্মক জিহাদ
আর আক্রমনাত্মক জিহাদের অর্থ হলো, মুসলমানদের পক্ষ থেকে কাফের শত্রুকে তাদের দেশে জিহাদের জন্য আহ্বান করা। এ প্রকার জিহাদের জন্য কোনো কোনো আহলে ইলম ইমাম ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র থাকা শর্তযুক্ত করেছেন। কিন্তু অগ্রাধিকারযোগ্য মত হচ্ছে আক্রমণাত্মক জিহাদও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ও ইমাম ছাড়া বিশুদ্ধ।
ইমাম ইবনু কুদামা রহ. বলেন
فإن عدم الإمام لم يؤخر الجهاد؛ لأن مصلحته تفوت بتأخيره، وإن حصلت غنيمة قسمها أهلها على موجب أحكام الشرع
যদি খলিফা বা ইমাম বিদ্যমান না থাকে তাহলে জিহাদ বিলম্বিত করা হবে না। কারণ, বিলম্ব করার দ্বারা জিহাদের কল্যাণ হাতছাড়া হয়ে যাবে৷ সেক্ষেত্রে যদি কোন গনিমত অর্জিত হয়, তাহলে তা শরিয়তের বিধান অনুসারে গনিমতের হকদাররা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেবে। – আল-মুগনি : ১০/৩৭৫
সুতরাং যদি ইমাম বিদ্যমান থাকা জিহাদ শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্তই হতো, তাহলে ইমামের অনুপস্থিতিতে জিহাদ স্থগিত রাখা এবং ইমাম পাওয়া যাওয়া পর্যন্ত তা বিলম্বিত করা ওয়াজিব হতো । তখন কোনোভাবেই মুসলমানদের কল্যাণের স্বার্থে তা চালিয়ে নেওয়ার অবকাশ থাকত না এবং গনিমত ভক্ষণও বৈধ হতো না৷