লিবারেল দর্শনে ‘স্বাধীনতা’ বলতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইবাদত ও আনুগত্য থেকে বের হয়ে নিজের নফস ও খেয়ালখুশির দাসত্ব করাকে বুঝায়। এই দর্শন মনে করে মানুষ স্বাধীন, সার্বভৌম এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার কোনো রব বা প্রতিপালকের প্রয়োজন নেই। রবের নির্দেশনা মানারও প্রয়োজন নেই। সে নিজেই নিজের রব। সে নিজের জন্য যা ভালো মনে করবে তাই হবে ভালো আর যা সে খারাপ মনে করবে তাই হবে মন্দ।
এই দর্শনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আনুগত্য করা এবং তাঁর আইন মেনে চলার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং এমন করা হল এক প্রকারের দাসত্ব। স্বাধীন লিবারেল যে কোন ব্যক্তি এসব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করে। সে নিজেই নিজের জন্য আইন বানায়। লিবারেল দার্শনিকদের মতে লিবারেল মানুষের রচিত আইনের ওপরে অন্য কোন আইন হতে পারে না। হবস থেকে রুশো পর্যন্ত সকল দার্শনিকদের মধ্যে এ বিশ্বাস বিরাজমান ছিল।
যা কিছু ব্যক্তির পছন্দ, যা কিছু তার মনকে সুখী করবে, তার খেয়ালখুশিকে পরিতৃপ্ত করবে, লিবারেল দর্শনের মতে তা সবই বৈধ। নিজের সুখ, সন্তুষ্টি, পরিতৃপ্তি হল সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। লিবারেলিজম এমন একটি দর্শন যা সকল মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। লিবারেলিজমের প্রথম ধাপই হল আসমানী ও প্রাকৃতিক বিধানকে অস্বীকার করা।
বলাবাহুল্য, লিবারেল সমাজে অধিকাংশের চিন্তাভাবনা চালিত হয় লিবারেল মূল্যাবোধের কাঠামোর ভিতরে। লিবারেল দর্শন কার্যত শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্র, ও সমাজ থেকে নৈতিকতাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের সকল বোধ জনপরিসর থেকে অপসারিত হয়। সেই জায়গা দখল করে লিবারেল মূল্যবোধ। লিবারেলিজম তার নিজস্ব নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শিল্প, ফ্যাশন, সাহিত্য, আইন এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
অধিকাংশ জনগণের চাহিদা অনুযায়ী লিবারেল সমাজে কখনো সমকামিতা অবৈধ হতে পারে আবার কখনো বৈধ। কখনো মদ অবৈধ হতে পারে, কখনো বৈধ। আবার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যিনা বৈধ হলেও লিবারেল মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হবার কারণে ১৮ কিংবা ১৬ বছরের নিচে বিয়ে অবৈধ। বহুগামীতা, লিভ টুগেদার এবং একাধিক বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড কালচার ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তর্ভূক্ত হলেও আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বহুবিবাহ অপরাধ। গণতন্ত্র কিংবা নারী অধিকার চাপিয়ে দেয়ার জন্য যুদ্ধ করা মহৎ কাজ হলেও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করা সন্ত্রাস।
মধ্যযুগে ইউরোপের খ্রিস্টানরা খ্রিষ্ট ধর্ম রক্ষা ও প্রচারের নামে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করেছিল। ইতিহাসের পাতায় ইউরোপের এ আগ্রাসন ক্রুসেড নামে পরিচিত। মধ্যুযগের ক্রুসেডের অনুকরণে আধুনিক যুগের নব্য ক্রুসেডাররা তাদের লিবারেল ধর্ম চাপিয়ে দেয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করছে। গণতন্ত্র, নারী অধিকার, স্বাধীনতা আর সেকুলারিজম প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমকে হত্যা করছে।
লিবারেল মতাদর্শী মুশরিকদের কালিমা
বিশ্বাস ও কর্ম, উভয় দিক থেকে লিবারেলিজম হল মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। বিশ্বাসগতভাবে এটি হল কুফর ও শিরকে আকবর। লিবারেল মতাদর্শী প্রথমে আল্লাহর কর্তৃত্ব, আনুগত্য এবং বিধানাবলীকে প্রত্যাখ্যান করে। এরপর সেখানে সে বসায় নিজের নফস ও খেয়ালখুশিকে। জীবন চলার ক্ষেত্রে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখাকে অস্বীকার করে সে নিজেই নিজের জন্য সীমারেখা ঠিক করে। আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে নিজের খেয়ালখুশি ও নফসের আনুগত্য করে। বিশ্বাসগত দিক থেকে লিবারেলিজম ঈমান ও তাওহিদের মূলকেই অস্বীকার করে।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-‘আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই’ এর পরিবর্তে লিবারেলজিম গ্রহণ করে ‘লা ইলাহা ইল্লান্নাস’-‘জনগণ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই’ এই কালেমা।
লিবারেল মতাদর্শীদের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে আল্লাহ তাআলার এই কথায়-
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَـٰهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّـهُ عَلَىٰ عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّـهِ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
আপনি কি লক্ষ্য করছ তাকে, যে তার খেয়াল খুশীকে নিজের মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয় মোহর করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব, কে তাকে পথ নির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবেনা? -সুরা জাসিয়াহ: ২৩
লিবারেল মতাদর্শী মুশরিকদের যত অপকর্ম
আজ আমরা এমন এক দুনিয়াতে বাস করছি যেখানে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে, সমকামি বিবাহকেও আইনী স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকাকে সম্পূর্ণ উলটে দেয়া হচ্ছে। সব ধরনের যৌনতা, সব ধরনের বিকৃত রুচির কাজকে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে আল্লাহ ও নবী রসূলগণের বিরুদ্ধে জঘন্য কুৎসারটনা ও মিথ্যাচারকে বাকস্বাধীনতার নামে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। মুখে মানবাধিকারের কথা বলে প্রতি বছর কোটি কোটি গর্ভস্থিত শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। শান্তির কথা বলে বিশ্বজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। সমতার কথা বলে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বানানো হয়েছে যা ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক সম্পদের বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে। পরিবার, সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। লিবারেলিজম এমন এক কুৎসিত মতাদর্শ যা জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করে ছেড়েছে।
বর্তমানে লিবারেলিজম যে কুৎসিত এক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে তাতো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যিনা-ব্যাভিচার, সমকামিতা, সমকামি বিবাহ, গর্ভপাত, পর্নোগ্রাফিসহ সব ধরনের অশ্লীলতা, নোংরামি এবং কুফর ও শিরক, নাস্তিক্যবাদ, নারী পুরুষের সীমানা মুছে দেয়া, পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া, সামাজিক মূল্যাবোধের অবক্ষয়সহ আর কোন অপকর্মটি বাকি আছে যা এই সভ্যতায় নেই?
লিবারেলিজম প্রকৃতার্থে শয়তানী আদর্শ
মানুষ যখন আল্লাহর নির্ধারিত সীমাকে অস্বীকার করে, ভালোমন্দের চিরন্তন মাপকাঠিকে প্রত্যাখ্যান করে কেবল ভোগ বিলাস এবং নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী চলাকে জীবনের লক্ষ বানিয়ে নেয়, তখন সে আর আশরাফুল মাখলুকাত থাকে না, সে তখন চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট এক প্রাণীতে পরিণত হয়। সে যখন নিজ কামনাবাসনার কাছে আত্মসমর্পণ করে, কামনাবাসনা চরিতার্থ করাকেই জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নেয় তখন সে তার চাহিদা আর খেয়ালখুশির দাসে পরিণত হয়। আর তখন সে ক্রমাগত সীমালঙ্ঘন আর পাপাচারের সমুদ্রে তলিয়ে যেতে থাকে।
লিবারেলিজমের দর্শন এমন সমাজ ও সভ্যতা তৈরি করেছে, যার দিকে তাকালে একজন বিবেকবান মানুষ নিঃসন্দেহে একে একটি শয়তানী আদর্শ বলে চিহ্নিত করতে বাধ্য হবে। এই দর্শন ভালোমন্দের সংজ্ঞা উলটে দিয়েছে, আল্লাহর দাসত্বকে নফসের দাসত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখাগুলো লঙ্ঘন করাকে স্বাধীনতা বলে নাম দিয়েছে। এ এমন এক দর্শন যা মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে। সত্যকে মানুষের সামনে কদর্য ও কলুষিত করে তুলে ধরে। লিবারেলিজম বনি আদমকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে যা আসমানী হিদায়াতের সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের জন্য যে পথ নির্ধারণ করে দিয়েছেন লিবারেলিজম তাদেরকে সে পথ থেকে বিচ্যুত করেছে এবং তাকে নিয়ে গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক পথে।
মূলত লিবারেলিজম হল শয়তানী আদর্শ। লিবারেলিজমের আজকের বাস্তবতার মাঝে বনি আদমের চিরশত্রু ইবলিসের বক্তব্যের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় –
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ
সে বলল, ‘হে আমার রব, যেহেতু আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তাই যমীনে আমি তাদের জন্য (পাপকে) শোভিত করব এবং তাদের সকলকে পথভ্রষ্ট করব’।-সূরা হিজর: ৩৯
লিবারেলিজমের মূল মন্ত্র আর শয়তানী আদর্শ হুবহু এক। দেখুন, লিবারেলিজমের মূল মন্ত্র হল, ‘মানুষের বিবেক সবচেয়ে বড় আদালত’। ‘তোমার যা ভালো লাগে তাই করো’। ‘তুমি নিজেই ভাগ্যবিধাতা, তুমি নিজেই ভালোমন্দ ঠিক করো’। এই ধরনের চিন্তা আধুনিককালে যারা সরাসরি শয়তান উপাসনা করে তাদের দর্শনেরও মৌলিক ভিত্তি।
লিবারেলিজমে বিশ্বাসীরা অন্ধকারে নিমজ্জিত
লিবারেল মতাদর্শীরা নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে, অথচ আদতে তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের গোলাম। নিজের খেয়ালখুশির গোলামে পরিণত হওয়া এ ধরনের ব্যক্তিদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই সহজ। নিয়ন্ত্রনকারী সরকার বা সাম্রাজ্যবাদ কিংবা শয়তান, যেই হোক। লিবারেলিজমের কথিত স্বাধীনতা ব্যক্তিকে খেয়ালখুশির গোলামে পরিণত করে আর সমাজ ও সভ্যতাকে জঘন্য জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। এই দর্শন আজ সারা বিশ্বকে কলুষিত করে ফেলেছে। লিবারেলিজমের এ বিষ জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে বর্তমানে অনেক মুসলমানের চিন্তা চেতনায়ও ঢুকে পড়েছে। ইসলামের জন্য আন্দোলন করার দাবিদাররাও এ থেকে মুক্ত নন। অনেকে আবার ইসলামকে লিবারেলিজমের আদলে বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের ফিতনা সম্পর্ক সঠিক জ্ঞান লাভ করার তাওফিক দান করুন এবং সকল ফিতনা থেকে হেফাজত করুন, আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।