প্রবন্ধ

ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি : আপনার ঈমান বাঁচান!

প্রকাশকাল: 18/03/2025

ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি : আপনার ঈমান বাঁচান!

মুসলিমদের মূল শক্তি হল আকিদার শক্তি। ইসলাম ছাড়া সমস্ত ধর্ম বিনষ্ট হওয়ার কারণ হচ্ছে আকিদার শক্তিহীনতা। মহান আল্লাহ আমাদের ওপর অনেক বড় অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি আমাদেরকে এমন এক আকিদা দিয়েছেন যা কিয়ামত অবধি স্থায়ী হবে। এই পৃথিবীর ক্যান্সার কুফফাররা শয়তানের গোলামী করে নিজেদের আকিদা বিসর্জন দিয়েছে। আবার সেই কুফফার শক্তিরই আরেকটা শয়তানি পরিকল্পনা হচ্ছে যেকোনো মূল্যে মুসলিমদের আকিদা নষ্ট করতে হবে।

দীর্ঘ দিনের ক্রুসেইড যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ইসলামের দুশমনরা বুঝতে পেরেছে যে, ইসলামের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধে মুসলিমদের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তাই তারা নিজেদের শয়তানি আকিদা বিজয় করার আশায় অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ভিন্ন একটি পথ বেছে নিয়েছে। আর সেই ভিন্ন পথটিই হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তারা চায়, ইসলামী আকিদাকে বিনষ্ট করে দিতে। ঈমান ও কুফরের সীমারেখা উঠিয়ে দিতে। আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার আকিদা বিস্মৃত করে দিতে। ধর্মে ধর্মে ব্যবধানের মানসিকতা মুসলিমদের থেকে উঠিয়ে দিতে।

এ ঘৃণ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তারা বিশ্বব্যাপী আয়োজন করলো ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি নামে এক জগাখিচুড়ী মার্ক ধর্ম। যাকে আরবিতে বলা হয় “ওয়াহ দাতুল আদইয়ান”। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু কুলাঙ্গার শাসকও এই কুফরি মিশনের পূর্ণ অংশীদার। এই ইন্টারফেইথ মিশনে অংশীদার নামদারি মুসলিমরা আসলে ইসলাম ধর্মের পাহারাদারি বাদ দিয়ে কুফফারদের গোলামীর আয়েশি জীবনকে আনন্দচিত্তে গ্রহণ করছে।

ইইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির মৌলিক স্লোগানগুলো হচ্ছে, ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ নেই। কোনো বিদ্বেষ নেই। এক ধর্ম অন্য ধর্মের অনুসারীদের ওপর প্রাধান্যতা নেই। ধর্মের কারণে যুদ্ধ করা কোনো ধর্ম সমর্থন করে না। ধর্ম শুধু ভালোবাসতেই শেখায়। শুধু সম্প্রীতিই শেখায়। সব ধর্মের একই কথা সবার উপর মানবতা। যারা ধর্মের ভিত্তিতে ব্যবধান করতে চায়, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়, অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা উগ্রবাদী। তারা জঙ্গি। তারা সন্ত্রাসী। তারা শান্তি-সম্প্রীতির জন্য ‍হুমকি।

এগুলো তাদের মুখরোচক কথা ছাড়া আর কিছু না। বাস্তবতা আসলে ভিন্ন কিছু। তারা দেশে দেশে মুসলিমদের নির্যাতন করে যাচ্ছে। ফিলিস্তিন, সিরিয়া, আফগান, উইঘুর ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তারা জেনোসাইড চালিয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্বের মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়ার সময় তাদের সম্প্রীতির কথা মনে থাকে না।

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিতির কিছু মৌলিক বিষয়। এর বিপরীতে ইসলামের অবস্থান

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিতি বলে : নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ এবং অন্য ধর্মকে খাটো করে দেখা যাবে না।

বিপরীতে ইসলাম বলে : আল্লাহ তাআলার কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম। অন্যান্য সকল ধর্ম বাতিল ও পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তার থেকে তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হবে।” –সূরা আলে ইমরান : ৮৫

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিতি বলে : কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না। সব ধর্মকে সমান চোখে দেখতে হবে।

বিপরীতে ইসলাম বলে : ইসলাম সকল ধর্মকে মানসুখ-রহিত করে দিয়েছে। ইসলাম ছাড়া সব ধর্ম বাতিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

وَالَّذِى نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ يَسْمَعُ بِى أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ يَهُودِىٌّ وَلاَ نَصْرَانِىٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِى أُرْسِلْتُ بِهِ إِلاَّ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ

“ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! এই উম্মতের ইহুদি নাসারা যেকোনো লোক আমার (আগমনের) কথা শুনবে তারপর আমি যে দ্বীন নিয়ে এসেছি তাতে ঈমান না এনেই মারা যাবে নিঃসন্দেহে সে জাহান্নামি হবে।” –সহীহ মুসিলম : ৪০৩

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিতি বলে : বন্ধুত্বের মাপকাঠি ধর্ম নয় বরং মানবতা। সকল মানবকে ভালোবাসতে হবে। ধর্মের দিক বিবেচনা করা যাবেনা।

বিপরীতে ইসলাম বলে : মুমিনকে ভালোবাসা ও নুসরত করা এবং কাফেরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা ঈমানের দাবি । মুমিনরা সৃষ্টির সেরা এবং আল্লাহর প্রিয়পাত্র। আল্লাহর এই প্রিয়পাত্রদের ভালোবাসা ও নুসরত করা। অপরদিকে আল্লাহর দুশমনদের সাথে দুশমনি পোষণ করা ঈমানের দাবি। এই আকিদারই নাম আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إن أوثق عرى الإيمان أن تحب في الله، وتبغض في الله

“নিঃসন্দেহে ঈমানের সর্বাপেক্ষা মজবুত হাতল হলো, তুমি আল্লাহরই জন্য ভালোবাসবে, আল্লাহরই জন্য ঘৃণা করবে।” –মুসনাদে আহমাদ : ১৮৫২৪

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিতি বলে : পড়াশুনা নিজ ধর্মে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। অন্য ধর্মে কী লেখা আছে জানতে হবে।

বিপরীতে ইসলাম বলে : নির্বিচারে মানার জন্য অন্যান্য যেকোনো ধর্মীয় কিতাব পড়া ও মেনে নেওয়া হারাম। জাবের রা. বলেন,

النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ أَتَاهُ عُمَرُ فَقَالَ إِنَّا نَسْمَعُ أَحَادِيثَ مِنْ يَهُودَ تُعْجِبُنَا أَفْتَرَى أَنْ نَكْتُبَ بَعْضَهَا؟ فَقَالَ: أَمُتَهَوِّكُونَ أَنْتُمْ كَمَا تَهَوَّكَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً وَلَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا اتِّبَاعِي

”উমার রা. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, আমরা ইয়াহুদীদের নিকট কিছু এমন কথা শুনি যা আমাদেরকে ভালো লাগে। আপনার কী রায়, তার কিছু লিখে নেব কি? তা শুনে তিনি বললেন, তোমরাও কি নির্বিচারে সব কিছু মেনে নিতে চাও, যেমন ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা মেনে নিয়েছে? যদি মূসা জীবিত থাকতেন, তাহলে আমার অনুসরণ ছাড়া তাঁর অন্য কোন এখতিয়ার ছিল না।” –মুসনাদে আহমাদ : ১৫১৫৬

উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রথম তিনটি সরাসরি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ও কুফর, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয়। আর চতুর্থটি সরাসরি কুফর না হলেও কুফরের দিকে ধাবিতকারী। উপরোক্ত আলোচনার পর এটা স্পষ্ট যে, আন্তঃধর্মীয় নামে সম্প্রীতিবাদীরা যেসব দাওয়াত প্রচার করতে চাচ্ছে তা ‍ইসলামের আকিদা ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র।

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সম্পর্কে আলেমদের ফাতাওয়া

শায়খ নাসির বিন হামদ আলফাহাদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ইনস্টিটিউট এবং তাতে অংশগ্রহণের কি বিধান’? উত্তরে শায়খ ‘ওয়া ইসলামাহ’ এর প্রথম পৃষ্ঠায় বলেন,

فهذا مركزٌ خبيثٌ، مناقضٌ لدين الإسلام، محاربٌ لله ورسوله، منافٍ لملة إبراهيم، هادمٌ للولاء والبراء، مكذّبٌ للنصوص المتواترة الآمرة بمعاداة الكفار والبراءة منهم، قاصمٌ لأوثق عرى الإيمان (الحب في الله والبغض في الله)، معطّلٌ لأحكام الجهاد في سبيل الله، مغيّرٌ لدين المسلمين، ومعارضٌ للتوحيد تمام المعارضة

“এটি একটি খবিস ইনস্টিটিউট। দ্বীনে ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। মিল্লাতে ইবরাহীমের সম্পূর্ণ বিপরীত। ওয়ালা বারা আকিদা বিধ্বংসী। কুরআন সুন্নাহর অসংখ্য মুতাওয়াতির নসকে মিথ্যাপ্রতিপন্নকারী; যেসব নস পরিষ্কার নির্দেশ দিচ্ছে কাফেরদের সাথে দুশমনি রাখতে এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। এটি ঈমানের মজবুত হাতল ‘আলহুব্বু ফিল্লাহ ওয়ালবুগদু ফিল্লাহ-আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহর জন্যই দুশমনি’ আকিদার ধুলিস্যাৎকারী। জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর বিধান নির্মূলকারী। দ্বীনে ইসলামের পবির্তনকারী। তাওহিদের সাথে শতভাগ সাংঘর্ষিক।”

সৌদি ইফতা বোর্ড লাজনায়ে দায়েমা তাদের ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন-

فإن الدعوة إلى (وحدة الأديان) والتقارب بينها وصهرها في قالب واحد، دعوة خبيثة ماكرة، والغرض منها خلط الحق بالباطل، وهدم الإسلام وتقويض دعائمه، وجر أهله إلى ردة شاملة

“সকল ধর্মকে এক ধর্মে রূপান্তর, ধর্মসমূহের পরস্পর সম্প্রীতি এবং সকল ধর্মকে এক ছাঁচে গড়ে তোলার আহ্বান একটি খবিস ও প্রতারণাপূর্ণ আহ্বান। এর উদ্দেশ্য হক বাতিল গুলিয়ে ফেলা। ইসলাম ধ্বংস করা এবং ইসলামের মূল ভীতসমূহ ভেঙে দেয়া। -ফাতাওয়া লজনায়ে দায়েমা: ১২/৩৫৬-৩৫৮

আল্লাহ আমাদের মুসলিম জাতিকে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি নামের এই ভয়ংকর শিরকি ফিতনা থেকে হেফাযত করুন। আমীন।

Scroll to Top