মুরজিয়া শব্দটি “আল-ইরজা” থেকে বিলম্বিত করা, অবকাশ দেয়া, ছাড় দেয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোন ব্যক্তি ইমান আনার পর কুফরি কোন কাজ করলেও কাফির হবে না- এই আকীদার প্রবক্তাদের মুরজিয়া বলা হয়।
মুরজিয়া ও খারেজি ফিরকা একে অপরের বিপরীত। খারেজিদের মতে যে কোন কবিরা গুনাহ করলেই মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফির হয়ে যায়। অপরদিকে মুরজিয়াদের আকীদা হচ্ছে, ঈমান হল অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার নাম। তাসদীকে কলবী বা আন্তরিক বিশ্বাস থাকা অবস্থায় শিরকে আকবর, কুফুরে আকবর বা ঈমান ভঙ্গের কোন কারণে লিপ্ত হলেও ব্যক্তি কাফির হয়না।
মুরজিয়ারা স্পষ্ট কুফরি করার পরেও কাউকে তাকফীর (কাফির বলে ঘোষণা) করতে রাযি নই। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে চায় যে, কাউকে তাকফীর করার অধিকার কারো নেই। তারা সুস্পষ্ট কুফরী কাজকে জুহুদ (অন্তরে অস্বীকার) ও ইস্তিহলাল (হালাল মনে করা) এর শর্তের মাধ্যমে সীমিত করে দেয়। যেমন কেউ মূর্তিকে সিজদা করলো। মুরজিয়ারা বলবে- সিজদাকারী যদি মূর্তিসিজদাকে ইস্তিহলাল (হালাল মনে) করে থাকে তাহলে কাফির হবে, অন্যথায় সে মুসলিমই থেকে যাবে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রা. আস-সারিমুল মাসলুলে এই প্রকারের মুরজিয়াদেরকে জাহামিয়া বলে উল্লেখ করেছেন-
وهم الجهمية الإناث الذين ذهبوا مذهب الجهمية الأولى في أن الإيمان هو مجرد التصديق الذي في القلب و إن لم يقترن به قول اللسان و لم يقتض عملا في القلب ولا في الجوارح
তারা হল সেই জাহমিয়া যারা প্রথম জাহমিয়াদের মতবাদ অনুসরণ করে, যে ঈমান হল কেবল অন্তরের বিশ্বাস। যদিও এর সাথে যবানের স্বীকৃতি না থাকে এবং আমল না পাওয়া যায়। – আস-সারিমুল মাসলুল ৫১৫
সাহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফায়যুল বারিতে মুরজিয়াদের ঈমান বিষয়ক আকিদা নিয়ে আলোচনা এসেছে এভাবে-
مذهب المرجئة فقالوا : لا حاجة إلى العمل ومدار النّجاة هو التصديق فقط. فصار الأوَّلون والمرجئة على طرفي نقيض
মুরজিয়াদের প্রসিদ্ধ আকীদা হল ঈমান হল শুধু তাসদীকে কলবী তথা অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও আল্লাহকে চিনার নাম। আমল ঈমানের সাথে সম্পর্কহীন একটি বিষয়। ঈমান থাকলে ইবাদতে কোন উপকারিতা নেই, পাপেও একবিন্দু ক্ষতি নেই। অতএব ঈমান থাকলেই ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমলের কোনই প্রয়োজন নেই। সারা জীবন কেউ পাপের সাগরে ডুবে থাকলেও কোন সমস্যা নেই। জান্নাত তার জন্য অবধারিত। কক্ষনো জাহান্নামে প্রবেশ করবেনা। – ফায়যুল বারি: ১/১২৮
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এই দুটি ভ্রান্ত মতবাদের মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি কোন কুফরী কাজ সম্পাদন করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। আর যদি কেউ সাধারণ কাবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, তাহলে সে কাফির হবেনা বরং ফাসিক হবে। ঈমান হচ্ছে কথা, কাজ ও অন্তরের বিশ্বাসের নাম। ঈমানের বিপরীত কাজ করলেই কুফুর হবে। অর্থাৎ কুফর হতে পারে কথায়, হতে পারে কাজে বা বিশ্বাসে যা ঈমানের মূলকে নষ্ট করে দেয়। আর কুফর ও ঈমান একত্রে অবস্থান করতে পারে না।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহের কাছে ঈমানের সংজ্ঞা হচ্ছে-
أهل السنة والجماعة يعتقدون بأن الإيمان قول باللسان واعتقاد بالجنان وعمل بالجوارح والأركان
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বিশ্বাস করে যে ঈমান সুসম্পন্ন হয় যবান দ্বারা বিবৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্মের মাধ্যমে। – আল-ঈমান ইনদাস সালাফ ওয়া মুখালিফিহিম: ৩৫
ঈমানের সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রা. এবং অন্য ইমামদের মাঝে যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত তা শুধুই শব্দগত পার্থক্য। বাস্তবে ওপরে উল্লেখিত ঈমানের সংজ্ঞায় আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এর সকল ইমাম একমত। হিন্দুদের নববর্ষ উৎসবের দিন নামধারী কোন মুসলিম যদি মুশরিককে উপহার দেয়, তাহলে সেটাও তার ঈমান ভংগকারী বলে গণ্য হবে। ঈমান ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে সবাই একমত, কিন্তু কী কারণে ঈমান ভেঙেছে সেই ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানিফা রা. একভাবে দিয়েছেন, অন্যরা ভিন্নভাবে দিয়েছেন। পার্থক্য শুধু এতটুকুই।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বে মুরজিয়াদের আকিদা অনেক প্রচার হয়। তারা মুখে দাবী করে যে, তারা ঈমানের ব্যাপারে আহলে সুন্নাহর মত অনুসরণ করে। কিন্তু বাস্তবে তারা মুরজিয়াপনা প্রচার করে বেড়ায়। বিশেষকরে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মুসলিম নামধারী শাসক গুটিকয়েক শায়খকে এই দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে যে, তারা মুরজিয়াপনা প্রচার করবে, শাসকদের কুফরিকে গোপন করবে, ইয়াহুদিদের স্বার্থে কথা বলবে। এই শায়খরা মুসলিম দেশগুলোতে খারিজিপনা ও মুরজিয়াপনা উভায়টাই প্রচার করে। অর্থাৎ এই দুনিয়াদার শায়খরা শাসকদের কুফরিকে ঈমানের পোশাক পরায় আবার সাধারণ মুসলিমদের কাবিরা গুনাহকে কুফরের আবরণ লাগায়।